
মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা কেমন খেলবে, এই প্রশ্নের একটা বড় উত্তর পাওয়া গেল কর্দোবায়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোরে মারিও আলবার্তো কেম্পেস স্টেডিয়ামে ফিফা প্রীতি ম্যাচে বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। বিশ্বকাপের পর এটাই ছিল তাদের প্রথম ম্যাচ।
মেসির জাতীয় দল থেকে অবসরের পর এটা আর্জেন্টিনার নতুন অধ্যায়ের শুরু। প্রথম ম্যাচেই তরুণরা দেখিয়ে দিলেন, দল একজনের ওপর নির্ভর করে চলছে না।
খেলার শুরু থেকেই চাপ ছিল স্বাগতিকদের হাতে। বল বেশির ভাগ সময় ঘুরেছে বলিভিয়ার ডি বক্সের আশপাশে। সফরকারীরা পাল্টা আক্রমণে কিছুই করতে পারেনি। রক্ষণও ছিল বেশ জমাট।
১৯ মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মাক আলিস্তেরের বাড়ানো বল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি লাউতারো মার্তিনেস। কিন্তু বল কাছেই ছিল, সেটা নিয়ে ডি বক্সে ঢুকে একটু সময় নিলেন। তারপর পোস্ট ঘেঁষে শট। ডানে ঝাঁপিয়েও বল ধরতে পারেননি গোলরক্ষক।
এই গোলে একটা তথ্যও জুড়ল। মেসির পর বর্তমান দলের গোলদাতাদের তালিকায় লাউতারোর দ্বিতীয় স্থান আরও শক্ত হলো।
২৯ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাজ। এজেকিয়েল পালাসিওসের রক্ষণ চেরা পাস ধরে তিনি ঢুকে পড়েন বক্সে। এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে প্রথম স্পর্শেই বল জালে। জাতীয় দলের হয়ে এটা তাঁর দ্বিতীয় গোল।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ৩-০ করার সুযোগ পেয়েছিলেন হুলিয়ান আলভারেস। কিন্তু বক্সে লাউতারো কয়েকজনের ভিড়ে আটকে থাকায় কাটব্যাকের জায়গা মেলেনি। শট নিতে দেরি হলো, কোণও কঠিন হয়ে গেল। গোল হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আসে তৃতীয় গোল, আর এটাই ম্যাচের সবচেয়ে আবেগের মুহূর্ত। নিকো পাজের ফ্রি কিক থেকে দারুণ হেডে জালে বল পাঠান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো।
এই ম্যাচে তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক। জন্মও কর্দোবাতেই। নিজের শহরে, নিজের প্রদেশের মাঠে অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচে গোল। আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে রোমেরোর গোল এখন পাঁচটি, এবং পাঁচটিই হেডে। ছোটদের কাছে তাই তাঁর ডাকনাম ‘হেড মাস্টার’। এদিন গ্যালারিতে ১২ বছর বা তার কম বয়সী প্রায় আট হাজার শিশু ছিল, যাদের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে রোমেরোর নাম।
ম্যাচের পর রোমেরো বললেন, দিনটা তাঁর জন্য বিশেষ। দশ বছর আগে এই স্টেডিয়ামেই স্থানীয় ক্লাব বেলগ্রানোর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। সেখান থেকে জাতীয় দলের সেরা সময়ের অংশ হয়েছেন, আর এখন ফিরলেন অধিনায়ক হয়ে। এটা কখনো কল্পনাও করেননি বলে জানালেন। দায়িত্ব বড়, তবে তিনি প্রস্তুত।
গ্যালারিতে ছিলেন তাঁর পরিবারের প্রায় ২০ জন। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ক্ল্যারিনকে মা রোসা গঞ্জালেস জানান, সকাল থেকে শুভেচ্ছার ফোনের ঠেলায় পরিবার নিয়ে একসঙ্গে নাশতা করারও সুযোগ হয়নি। ছেলের একাগ্রতা আর ত্যাগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ছেলের সাফল্যই তাঁর সাফল্য।
মজার ব্যাপার, ম্যাচের আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিলেন রোমেরোর চাচা। তাঁর কথা ছিল, রোমেরো হেডে গোল করবেন আর আর্জেন্টিনা জিতবে ২-১ ব্যবধানে। হেডে গোলটা মিলে গেল, স্কোরলাইন মেলেনি। দাদি শুধু বললেন, নাতির জন্য তিনি সব সময় খুশি।
আনুষ্ঠানিকভাবে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড এই প্রথম পেলেন রোমেরো। এর আগে তিনবার দায়িত্ব পালন করলেও সেগুলো ছিল অনানুষ্ঠানিক। মেসি জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার পর তিনিই নিয়মিত অধিনায়ক হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ম্যাচের শেষ দিকে গোল পান বদলি নামা হোসে মানুয়েল লোপেস। ৮৩ মিনিটে ক্রসবারের ওপর দিয়ে শট মেরেছিলেন, ৮৫ মিনিটে অফসাইডের কারণে একটি গোল বাতিল হয়। তবু হাল ছাড়েননি। ৮৬ মিনিটে ডি বক্সে বল পেয়ে জালে পাঠালেন। জাতীয় দলের হয়ে এটাই তাঁর প্রথম গোল।
যোগ করা সময়ে লিওনেল ফ্লোরেসের হেড ঠেকিয়ে ব্যবধান আরও বাড়তে দেননি বলিভিয়ার গোলরক্ষক। দুই অর্ধে দুটি করে গোল, আর্জেন্টিনার জয় ছিল পুরোপুরি একতরফা।
নতুন যুগের এই প্রথম ম্যাচে স্কালোনির সামনে আশার ছবিটা পরিষ্কার। লাউতারো আছেন গোলের জন্য। নিকো পাজ মেসির সেই সৃজনশীল ভূমিকার দায়িত্ব নিতে শুরু করেছেন। রক্ষণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রোমেরো। বেঞ্চ থেকে উঠে এসে গোল করছেন লোপেসের মতো নতুন মুখ।
তবে মেসির অভাব যে অনুভূত হবে, সেটা রোমেরো নিজেই মেনে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, অধিনায়ক লিওকে খুব মনে পড়বে, তাঁর মতো আর কেউ কখনো হবে না।
আর্জেন্টিনার সামনে এখনো দুটি ম্যাচ বাকি। মঙ্গলবার তারা খেলবে বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে, তার পরদিন বেনিনের বিপক্ষে। বেনিনের ম্যাচটিই হবে জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির বিদায়ী ম্যাচ।
