
পাহাড়ের কোলে আটকে থাকা এত বড় একটা জলরাশি দেখলে প্রথমে বিশ্বাসই হয় না যে এটা মানুষের তৈরি। কাপ্তাই লেক রাঙ্গামাটির সবচেয়ে বড় পরিচয়। সবুজ পাহাড়, নীল জল আর মাঝে মাঝে ভেসে থাকা মেঘ মিলিয়ে এখানকার দৃশ্য বদলাতে থাকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায়।
লেকটির জন্ম ষাটের দশকে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হয়, কাজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে। বাঁধের কারণে রাঙ্গামাটির প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানির নিচে চলে যায়। প্রায় এক লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল। চাকমা রাজার পুরনো রাজবাড়িও তলিয়ে যায় সেই সময়।
আকারটা একটু আন্দাজ করা দরকার। পানির উচ্চতা অনুযায়ী লেকের আয়তন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭৮০ বর্গকিলোমিটারের মতো ওঠানামা করে। বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এই লেকের পানিতেই চলে, যার সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট।
কাপ্তাই লেক দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় নৌকা বা বোট। রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার আর ঝুলন্ত সেতুর ঘাট, এই দুই জায়গা থেকেই বোট ভাড়া পাওয়া যায়। রিজার্ভ বাজার থেকে উঠলে পর্যটন এলাকায় যাওয়ার বাড়তি খরচটা বেঁচে যায়।
বোটে চড়ে সাধারণত যে পথে ঘোরা হয়, তা মোটামুটি এরকম। প্রথমে নতুন চাকমা রাজার বাড়ি, তারপর রাজবন বিহার, যা দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড় বিহার। এরপর শুভলং ঝরনা। সেখানে পাশাপাশি দুটি ঝরনা আছে, একটি ছোট আর একটি বড়।
দুপুরের খাবারের জন্য লেকের মাঝের কয়েকটি দ্বীপে রেস্তোরাঁ আছে। পেদা টিং টিং আর টুকটুক বেশ পরিচিত। এখানে বাঁশের চোঙায় রান্না করা ব্যাম্বু চিকেন, লেকের মাছের নানা পদ আর পাহাড়ি রং চা পাওয়া যায়। দল বড় হলে আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখা ভালো, নইলে অপেক্ষা করতে হয়।
খাওয়ার পর পলওয়েল পার্ক ঘুরে ঝুলন্ত সেতুতে যাওয়া যায়। এটিকে রাঙ্গামাটির প্রতীক বলা হয়। সেতুর কাছেই প্যাডেল বোট আর কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা আছে। লেকের বিভিন্ন স্পটে দ্রুত যেতে চাইলে স্পিডবোটও ভাড়া নেওয়া যায়।
আরেকটা অভিজ্ঞতা আছে, যা গত কয়েক বছরে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। সেটা হাউসবোটে লেকের ওপর রাত কাটানো। প্রথম আলোর মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন কাপ্তাইয়ে ১৩টি হাউসবোট সেবা দিচ্ছিল। লুসাই, রাঙ্গাতরী, সুখের তরী আর সেলোরা তাদের মধ্যে পরিচিত কয়েকটি।
হাউসবোটে সাধারণত এসি কেবিন, ডাইনিং স্পেস, আধুনিক টয়লেট আর খোলা ডেক থাকে। আকার অনুযায়ী একটি বোটে ১০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত থাকতে পারেন। চাইলে পাহাড়ি খাবার আর বারবিকিউয়ের আয়োজনও করা যায়। এক দিন এক রাত বা দুই দিন এক রাতের প্যাকেজ পাওয়া যায়।
খরচের হিসাব দুভাবে হয়। পুরো বোট নিলে দাম আলোচনা সাপেক্ষে ঠিক হয়। মাথাপিছু নিলে জনপ্রতি ৬ থেকে ৯ হাজার টাকার মতো লাগে। বোটভেদে কেবিনের মান আর সুবিধা আলাদা, তাই বুকিংয়ের আগে সরাসরি যোগাযোগ করে প্যাকেজে কী কী আছে জেনে নেওয়া দরকার। ঈদ বা লম্বা ছুটিতে দাম বাড়ে, বুকিংও আগে ভরে যায়।
হাউসবোটে না থাকলে রাঙ্গামাটি শহরেই হোটেল আর মোটেলের অভাব নেই। ঝুলন্ত সেতুর আশপাশে পর্যটন মোটেলসহ কয়েকটি মোটেল ও কটেজ আছে। শহরে হোটেল নিডস, প্রিন্স হোটেল আর নাদিশা ইন্টারন্যাশনালের নামও শোনা যায়। শান্ত পরিবেশ চাইলে আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের ধারে কয়েকটি রিসোর্ট আছে, যেমন বার্গী লেক ভ্যালি। বন বিভাগ, সেনাবাহিনী, পিডিবি আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউসেও থাকা যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে।
ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটির বাস আছে। কমলাপুর, সায়দাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান, গাবতলীসহ কয়েকটি জায়গা থেকে ছাড়ে। জ্যাম না থাকলে সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। নন-এসি বাসে ভাড়া সাধারণত ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, এসিতে ১২০০ থেকে ১৭০০ টাকার মতো। তবে ভাড়া সময়ভেদে বদলায়, টিকিট কাটার সময় কাউন্টারে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ট্রেনে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে আগে চট্টগ্রাম যেতে হবে। সেখান থেকে রাঙ্গামাটির বাসে উঠলে ভাড়া মোটামুটি ১৭০ টাকা, সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। সরাসরি ট্রেনে রাঙ্গামাটি যাওয়া যায় না। সাজেক থেকে আসলে প্রথমে খাগড়াছড়ি, সেখান থেকে বাসে রাঙ্গামাটি। খাগড়াছড়ি থেকে বাস প্রতি ঘণ্টায় ছাড়ে, ভাড়া ১৭০ থেকে ২০০ টাকা।
কখন যাবেন, সেটা নিয়ে একটা কথা আছে। কাপ্তাই লেকে সারা বছরই ঘোরা যায়। বর্ষায় ঝরনাগুলো পূর্ণ থাকে আর পাহাড়ে মেঘ নামে, তাই দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর লাগে। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে লেকের পানি বাড়লে বাঁধের জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। এ বছর সেপ্টেম্বরেও পানি বেড়ে ঝুলন্ত সেতু ডুবে গিয়েছিল। তখন প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল আর টিকিট বিক্রি বন্ধ ছিল। বর্ষায় রওনা দেওয়ার আগে রাঙ্গামাটির আবহাওয়া আর সেতুর অবস্থা জেনে নেওয়া ভালো।
শীতে আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে, আর নৌভ্রমণের জন্য এটাই সবচেয়ে স্বস্তির সময়। ভিড় এড়াতে চাইলে সরকারি ছুটি আর উৎসবের সময়টা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
যাওয়ার আগে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখুন। এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কারও ছবি তুলতে চাইলে আগে অনুমতি নিন। তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রাখুন। সেনা এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট বা ক্যাম্পের ছবি তোলা নিষেধ। জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সঙ্গে রাখুন, আর হোটেল ও বোট আগে থেকে বুক করে যান।
পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখলে সুবিধা হবে, কারণ লেকের মাঝে চার্জ দেওয়ার জায়গা কম। বোটে আবর্জনা ফেলার জন্য ডাস্টবিন থাকে, সেখানেই ফেলুন। লেকের জল আর পাহাড়ের সবুজ দুটোই আমাদের সবার সম্পদ।
সব মিলিয়ে কাপ্তাই লেক একদিনের ছোট ভ্রমণেও ভালো লাগে, আবার দুই-তিন দিনের লম্বা ছুটিতেও। বোটে ভেসে, ঝরনার কাছে গিয়ে আর হাউসবোটের ডেকে বসে সূর্যাস্ত দেখে ফিরলে এই লেকের আসল রূপটা বোঝা যায়।
