
ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার “দ্য গডফাদার” শুধু একটি গ্যাংস্টার সিনেমা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে একে ধরা হয় আমেরিকান সিনেমার সবচেয়ে বড় মাইলফলকগুলোর একটি হিসেবে। ১৯৭২ সালের মার্চে নিউ ইয়র্কে এর প্রিমিয়ার হয়। আর ২৪ মার্চ থেকে সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় প্রায় তিন ঘণ্টার এই মহাকাব্য।
গল্পটা নিউ ইয়র্কের কর্লিওনি পরিবারকে নিয়ে। সিসিলি থেকে আসা এই ইতালীয়-আমেরিকান মাফিয়া পরিবারের প্রধান ভিটো কর্লিওনি, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্লন ব্র্যান্ডো। পরিবারের ক্ষমতা, ভেঙে পড়ার ঝুঁকি আর ছেলে মাইকেলের (আল পাচিনো) ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার কাহিনি এখানে মূল সুর।
সিনেমাটি মারিও পুজোর বেস্টসেলার উপন্যাস থেকে নেওয়া। পুজোর বেড়ে ওঠা নিউ ইয়র্কের হেলস কিচেনে। তিনি শুরুতে পাল্প ম্যাগাজিনে গল্প লিখতেন। পরে চিত্রনাট্যও নিজেই লেখেন।

মজার ব্যাপার হলো, প্যারামাউন্ট প্রথমে কপোলাকে নিয়ে নিশ্চিত ছিল না। স্টুডিও কয়েকজন নামী পরিচালকের কাছে গিয়েছিল, শেষে ডাক পড়ে তখনকার তুলনামূলক অচেনা কপোলার। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩১।
বক্স অফিসে সিনেমাটি ছিল বিস্ফোরক। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এটিই প্রথম সিনেমা যা ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এটি হলিউডে নতুন একটি যুগের সূচনা করে। পরিচালকের স্বাধীনতা আর গভীর চরিত্রনির্ভর গল্পকে মূলধারায় নিয়ে আসার পেছনে এর বড় ভূমিকা ছিল।
পুরস্কারের হিসাবেও পিছিয়ে নেই। সিনেমাটি সেরা ছবি, সেরা অভিনেতা এবং সেরা অ্যাডাপ্টেড চিত্রনাট্য, এই তিনটি অস্কার জিতেছে। ব্র্যান্ডো অস্কার জিতলেও তা গ্রহণ করেননি।
১৯৭৪ সালে আসে “দ্য গডফাদার: পার্ট টু”, যা ছয়টি অস্কার জেতে, সেরা ছবি ও সেরা পরিচালকসহ। ১৯৯০ সালের “পার্ট থ্রি” কিছু ইতিবাচক রিভিউ পেলেও সাধারণভাবে ত্রয়ীর সবচেয়ে দুর্বল ছবি বলে গণ্য হয়।
এই সিনেমা যে সময়ে তৈরি হয়েছিল, সেটাও কম আলোচিত নয়। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, পেন্টাগন পেপারস প্রকাশ পাচ্ছে, আর ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ঘনিয়ে আসছে। অনেক সমালোচকের মতে, ক্ষমতা আর দুর্নীতি নিয়ে আমেরিকার সেই অস্বস্তিই ফুটে উঠেছে কর্লিওনিদের গল্পে।
সময় গড়ালেও সিনেমাটির আবেদন কমেনি। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সেরা মার্কিন সিনেমার তালিকায় এটি দ্বিতীয় স্থানে আছে। ২০২২ সালে ৫০ বছর পূর্তিতে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। এর আগে ৪৫ বছর পূর্তিতে ফ্যাথম ইভেন্টস, টার্নার ক্লাসিক মুভিজ ও প্যারামাউন্টের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সাতশোর বেশি সিনেমা হলে ছবিটি আবার দেখানো হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে কপোলা AFI লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। সেই অনুষ্ঠানে স্টিভেন স্পিলবার্গ গডফাদারকে “আমেরিকার সর্বকালের সেরা সিনেমা” বলেছেন। রবার্ট ডি নিরো মজা করে বলেছেন, তাঁকে মূল ছবিতে না নিয়ে সিক্যুয়েলে নেওয়া হয়েছিল।
নতুন খবরও আছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২০২৬ সালের মে মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্লিওনি পরিবারের গল্পে ২০২৭ সালে আসছে একটি নতুন গডফাদার উপন্যাস। শেষ উপন্যাসের পর দশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, তাই ভক্তদের আগ্রহ যে বাড়বে, তা বলাই যায়।
ছবিটির প্রভাব পর্দার বাইরেও পড়েছে। রাজনীতি, সংবাদ আর দৈনন্দিন কথাবার্তায় আমেরিকানরা এখনো গডফাদারের সংলাপ আর চরিত্র টেনে আনেন। “অফার ইউ ক্যান্ট রিফিউজ” কথাটা এখন প্রায় প্রবাদের মতো।
প্রথমবার দেখলে বা বহুবার দেখা থাকলেও, গডফাদার প্রতিবারই নতুন কিছু দেখায়। ধীর গতির গল্প, আলো-আঁধারের ছবি আর অভিনেতাদের নিখুঁত অভিনয় মিলে এমন একটি সিনেমা তৈরি হয়েছে, যার সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


