
১০ অক্টোবর, শনিবার রাত। লাস ভেগাসের বিখ্যাত স্ফিয়ার অ্যারেনায় মেটালিকার কনসার্ট চলছে। গান থামিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে এলেন ব্যান্ডের ভোকালিস্ট জেমস হেটফিল্ড। প্রথমে ভক্তদের ধন্যবাদ দিলেন। ভেগাসের বাইরে থেকে যাঁরা অনেক দূর পাড়ি দিয়ে, টাকা আর সময় খরচ করে এসেছেন, তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানালেন। এরপরই এল সেই কথাটা, যা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে।
হেটফিল্ড বললেন, মেটালিকা এখানে এসেছে অন্য কিছু “বিনোদনশিল্পীর” মতো দর্শকদের প্রভাবিত করতে নয়। বাইরের সব ঝামেলা ভুলে থাকার জন্যই এই আয়োজন। শেষে যোগ করলেন, মেটালিকার এজেন্ডা ভালোবাসা, শক্তি আর হেভি মিউজিক।
নাম কারও করেননি। কিন্তু সময়টা বিবেচনা করলে কাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা নিয়ে অনুমানের অভাব নেই।
কিছুদিন আগেই র্যাপার ম্যাকলমোর এড শিরানের স্টেডিয়াম ট্যুর থেকে বাদ পড়েছেন। মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে আবেগী বক্তব্য দেওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত আসে। জাক ব্রায়ান আর জেসন অ্যালডিনের মতো শিল্পীরাও মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক প্রসঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি শিরোনামে এসেছেন। তাই অনেকেই ধরে নিয়েছেন, হেটফিল্ডের কটাক্ষ এই প্রবণতাকেই লক্ষ্য করে।
ভিডিওটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। একদল ভক্ত খুশি। তাঁদের যুক্তি খুব সোজা। কনসার্টে মানুষ যায় কয়েক ঘণ্টার জন্য দুনিয়ার চাপ ভুলতে। টিকিটের দাম দিয়ে এসে বক্তৃতা শুনতে কে-ই বা চায়?
অন্যদিকে আরেকদল বলছেন, এটা আসলে এড়িয়ে যাওয়ার ভান।
এই দ্বিতীয় দলের সবচেয়ে ধারালো সমালোচনা এসেছে সংগীত সমালোচক আন্থনি ফ্যান্টানোর ইউটিউব চ্যানেল দ্য নিডল ড্রপ থেকে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, কেউ রাজনীতি নিয়ে কিছু না বললেও সেটা নিজেই একটা অবস্থান। আর মেটালিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও জটিল।
কারণটা বুঝতে একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৮৬ সালের অ্যালবাম “মাস্টার অব পাপেটস”-এর কভারে সারি সারি কবরের কুশ দেখা যায়। অ্যালবামের গানগুলোতে ব্যান্ডটি দেখিয়েছিল, কীভাবে সামরিক-শিল্প ব্যবস্থা সাধারণ সৈনিকদের যুদ্ধের যন্ত্রে পিষে ফেলে। সমালোচকের প্রশ্ন, যে ব্যান্ড একসময় এমন কথা বলেছে, তারা এখন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কথা বলাকে “বাড়াবাড়ি” বলে কীভাবে? তাঁর মতে, এটা দ্বিচারিতার মতো দেখায়।
চ্যানেলটির “দ্য বিগ মানি শো” অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট লু বাসেনিজ আর মাইকেল লি হেটফিল্ডের মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, হেটফিল্ড ঠিক জায়গায় আঘাত করেছেন। যেসব শিল্পী মঞ্চকে রাজনৈতিক প্রচারের জায়গা বানিয়ে ফেলেন, তাঁদের প্রতি এটা একটা সোজাসাপ্টা জবাব।
আসল কথা হলো, হেটফিল্ডের এই অবস্থান নতুন কিছু নয়।
২০১৬ সালে “হার্ডওয়ার্ড” অ্যালবামের প্রচারের সময়ও তিনি প্রায় একই কথা বলেছিলেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস আছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে সংগীত যতটা কাজ করে, রাজনৈতিক মতামত ততটা করে না, এই ছিল তাঁর যুক্তি। ২০০৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মত জানতে চাওয়া হলেও তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর সতীর্থ লারস উলরিচও একবার বলেছিলেন, হেটফিল্ডের সঙ্গে প্রায় সব বিষয়ে কথা হলেও ইচ্ছে করে রাজনীতির আলোচনা হয়েছে বলে তাঁর মনে পড়ে না।
তাহলে বিতর্ক কেন?
কারণ এবার তিনি শুধু নিজেকে সরিয়ে রাখেননি। অন্যদের দিকেও আঙুল তুলেছেন। নিরপেক্ষ থাকা আর অন্যের কাজকে কটাক্ষ করা এক জিনিস নয়, আর এই ফারাকটাই মূলত তর্কের ভিত্তি।
এই বিতর্কের মধ্যেই কনসার্টের অন্য খবরগুলো কিছুটা চাপা পড়ে গেছে।
ওই রাতের সেটলিস্টে ১৯৯৬ সালের অ্যালবাম “লোড”-এর জনপ্রিয় গান “আনটিল ইট স্লিপস” যোগ হয়েছিল। অক্টোবরে স্ফিয়ার রেসিডেন্সি শুরু হওয়ার পর এই প্রথম গানটি বাজানো হয়।
মেটালিকার এই রেসিডেন্সির নাম “লাইফ বার্নস ফাস্টার”। মোট ২৪টি শো নিয়ে এই আয়োজন চলবে ২০২৭ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত। অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার ও শনিবার শো রয়েছে। ড্রামার লারস উলরিচ আগে ইউটু-র শো দেখতে স্ফিয়ারে গিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন। এই ভেন্যুকে তিনি “আরেক স্তরের” জায়গা বলেছিলেন।
শিল্পীদের মঞ্চ ব্যবহার নিয়ে তর্ক নতুন নয়। কেউ মনে করেন, জনপ্রিয় মানুষের গলার জোর সমাজের জন্য কাজে লাগানো উচিত। কেউ মনে করেন, সংগীতের আসর রাজনীতিমুক্ত থাকাই ভালো। দুই পক্ষেরই যুক্তি আছে, আর এই বিতর্ক সহজে মিটবে বলেও মনে হয় না।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার। হেটফিল্ডের এক মিনিটের বক্তব্য এখন যেভাবে ভাইরাল, তাতে বোঝা যায় ভক্তরা শুধু গান শোনেন না, শিল্পীরা কী ভাবছেন সেটাও গভীরভাবে খেয়াল করেন।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


