
হাতে আঁকা ছবি, বাতাসে ভাসা আকাশযান, বনের গভীরে লুকিয়ে থাকা দেবতা। এই দৃশ্যগুলো যাঁর মনে পড়ে, তাঁর কাছে হায়াও মিয়াজাকির নাম অচেনা নয়। জাপানি অ্যানিমেশনকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে এই মানুষটির অবদান সবচেয়ে বড়।
আজকের লেখায় তাঁর পরিচালিত আটটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি সময়ের ক্রমে সাজানো হয়েছে। প্রতিটির পেছনের গল্পও থাকছে।
কে এই হায়াও মিয়াজাকি?

মিয়াজাকির জন্ম ১৯৪১ সালের ৫ জানুয়ারি, জাপানের টোকিওতে। ১৯৮৫ সালে তিনি স্টুডিও জিবলি প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। প্রযোজক তোশিও সুজুকির সঙ্গে তাঁর জুটি দীর্ঘ কয়েক দশকের।
তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য কয়েকটি বিষয়ে ধরা পড়ে। প্রকৃতির প্রতি গভীর টান, শক্তিশালী নারী চরিত্র, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান আর শৈশবের বিস্ময়। বেশিরভাগ ছবির চিত্রনাট্য তিনি নিজেই লেখেন।
১. দ্য ক্যাসল অব ক্যাগলিওস্ত্রো (১৯৭৯)

মিয়াজাকির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মাস্টার চোর লুপাঁ থ্রি-কে নিয়ে তৈরি এই অ্যাডভেঞ্চারে আছে রহস্যময় দুর্গ, জাল মুদ্রার চক্র আর দুঃসাহসী উদ্ধার অভিযান।
ছবিটি তখন বড় ব্যবসা করেনি। কিন্তু পরে সমালোচকেরা একে অ্যানিমেশনের অন্যতম সেরা অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার বলে স্বীকৃতি দেন।
২. মাই নেইবার টোটোরো (১৯৮৮)

দুই বোন সাতসুকি আর মেই গ্রামে নতুন বাড়িতে এসে দেখা পায় বনের বিশাল, নরম আত্মা টোটোরোর। ছবিতে কোনো খলনায়ক নেই, আছে শুধু শৈশবের নির্মল আনন্দ।
টোটোরো আজ স্টুডিও জিবলির প্রতীক। স্টুডিওর লোগোতেও এই চরিত্র দেখা যায়।
৩. পোর্কো রোসো (১৯৯২)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের ইতালি। এক প্রাক্তন পাইলট অভিশাপে শূকরের চেহারা পেয়েছেন, এখন তিনি অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে আকাশদস্যুদের ঠেকান। আকাশে লাল সীপ্লেন, নীল সাগর আর বিষণ্ণ রসিকতা মিলিয়ে ছবিটি বড়দের জন্য মিয়াজাকির এক অনন্য কাজ।
৪. প্রিন্সেস মনোনোকে (১৯৯৭)

মানুষ বনাম প্রকৃতির লড়াই নিয়ে মিয়াজাকির সবচেয়ে গম্ভীর ছবি। যুবক আশিতাকা অভিশাপ থেকে মুক্তি খুঁজতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে বনদেবতা আর লৌহনগরীর সংঘাতে।
এখানে কেউ পুরোপুরি ভালো বা মন্দ নয়। সেই জটিলতাই ছবিটিকে আলাদা করেছে। প্রকাশের সময় জাপানে এটি রেকর্ড ব্যবসা করেছিল।
৫. স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১)

দশ বছরের চিহিরো বাবা-মার সঙ্গে ঢুকে পড়ে আত্মাদের এক জগতে। বাবা-মা শূকরে পরিণত হন, আর চিহিরোকে কাজ করতে হয় রহস্যময় স্নানাগারে।
এটি মিয়াজাকির সবচেয়ে সম্মানিত কাজ। ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বেয়ার পায় এবং সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের অস্কার জেতে। একটি হাতে আঁকা, জাপানি ভাষার অ্যানিমেশন এই পুরস্কার পেয়েছে, এমন নজির খুব কম।
৬. হাউলস মুভিং ক্যাসল (২০০৪)

অভিশাপে বৃদ্ধা হয়ে যাওয়া তরুণী সোফি আশ্রয় নেয় জাদুকর হাউলের চলমান দুর্গে। যুদ্ধের পটভূমিতে এটি এক রোমান্টিক ফ্যান্টাসি। ডায়ানা উইন জোন্সের উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হলেও ছবির গল্প ও যুদ্ধবিরোধী বার্তা মিয়াজাকির নিজস্ব।
৭. দ্য উইন্ড রাইজেস (২০১৩)

বিমান নকশাকার জিরো হোরিকোশির জীবন থেকে অনুপ্রাণিত এই ছবি। এখানে কোনো জাদু নেই, আছে স্বপ্ন, সৃষ্টির আনন্দ আর যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা।
মুক্তির সময় মিয়াজাকি অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ছবিটি অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।
৮. দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন (২০২৩)

অবসর ভেঙে ফিরে আসার ছবি। মায়ের মৃত্যুর পর মাহিতো নামের এক কিশোর একটি রহস্যময় ধূসর হেরনের পিছু নিয়ে প্রবেশ করে অদ্ভুত এক জগতে। ছবিতে শোক, বেড়ে ওঠা আর উত্তরাধিকারের প্রশ্ন গভীরভাবে এসেছে।
২০২৪ সালে এটি সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের অস্কার জেতে। একই বছর গোল্ডেন গ্লোবও পায়। হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের জন্য এটি মিয়াজাকির দ্বিতীয় অস্কার।
মিয়াজাকির সর্বশেষ খবর (২০২৬)
২০২৬ সালের ১৭ মার্চ স্টুডিও জিবলির সভাপতি তোশিও সুজুকি ও পরিচালক গোরো মিয়াজাকি এক অনুষ্ঠানে হায়াও মিয়াজাকির নতুন প্রকল্পের ঝলক দেখান। প্রকল্পটির নাম প্যানোরামা বক্স, যেখানে আছে মিয়াজাকির নিজের হাতে আঁকা ছবি।
সুজুকির কথায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮৫ বছরে পা দেওয়া মিয়াজাকি এখনো কর্মচঞ্চল। গোরো জানান, বাবার সাম্প্রতিক রক্ত পরীক্ষার ফল তাঁর নিজের চেয়েও ভালো।
নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। বিভিন্ন মৃত্যু বা অবসরের গুজব ছড়ালেও সেগুলো যাচাইহীন, তাই বিশ্বাস না করাই ভালো।
নতুন দর্শকদের জন্য কোন ছবি দিয়ে শুরু করবেন?
- পরিবার নিয়ে দেখতে চাইলে: মাই নেইবার টোটোরো
- গভীর গল্প চাইলে: প্রিন্সেস মনোনোকে
- সেরা শুরু চাইলে: স্পিরিটেড অ্যাওয়ে
- রোমান্স ও ফ্যান্টাসি চাইলে: হাউলস মুভিং ক্যাসল
- আবেগঘন ছবি চাইলে: দ্য উইন্ড রাইজেস
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
মিয়াজাকির সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি কোনটি?
স্পিরিটেড অ্যাওয়ে। এটি অস্কার ও গোল্ডেন বেয়ার দুটোই জিতেছে।
মিয়াজাকি কয়টি অস্কার পেয়েছেন?
স্পিরিটেড অ্যাওয়ে ও দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরনের জন্য দুটি অস্কার। এর বাইরে ২০১৪ সালে তিনি সম্মানসূচক অস্কারও পেয়েছেন।
ছবিগুলো কি বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত?
টোটোরো ও হাউলস মুভিং ক্যাসল ছোটদের জন্য সহজ। প্রিন্সেস মনোনোকে ও পোর্কো রোসো তুলনায় বড়দের উপযোগী।
মিয়াজাকি কি এখনো কাজ করছেন?
হ্যাঁ। ২০২৬ সালের খবর অনুযায়ী তিনি প্যানোরামা বক্স প্রকল্পে কাজ করছেন।
প্রায় পাঁচ দশকে মিয়াজাকি দেখিয়েছেন, অ্যানিমেশন শুধু শিশুদের জন্য নয়। তাঁর ছবি একই সঙ্গে শিশুর কাছে জাদু আর বড়দের কাছে জীবনের প্রশ্ন। এই আটটি ছবির যেকোনোটি দিয়ে শুরু করলে তাঁর জগতে ঢোকা সহজ হবে।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


