Skip to content

স্ট্রিমিংয়ে এখনও কেন ২০১৫ আর ১৯৭৭ সালের গান শুনছে সবাই?

২০২৬ সালে স্ট্রিমিংয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই পুরনো গান। এআই প্লেলিস্ট, নস্টালজিয়া আর অ্যালগরিদম কীভাবে নতুন শিল্পীদের পিছিয়ে দিচ্ছে, জেনে নিন।

২০২৬ সালে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে যত গান শোনা হচ্ছে, তার বড় অংশই নতুন নয়। বিনোদন বিশ্লেষণ সংস্থা লুমিনেটের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে বাজানো গানের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর বা তারও আগে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র, দুই দেশেই গত ১৮ মাসে প্রকাশিত গানের স্ট্রিমিং পুরনো গানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

অথচ গান তৈরি হচ্ছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রতিদিন এক লক্ষেরও বেশি নতুন গান স্ট্রিমিং সেবাগুলোতে জমা পড়ছে। তাহলে শ্রোতারা কেন ফিরে যাচ্ছেন পুরনো দিনে?

একটা বড় কারণ হলো নস্টালজিয়া। প্রায় সব রেকর্ড করা গান এখন এক ট্যাপেই হাতের কাছে। তাই মানুষ ছোটবেলা বা কৈশোরের প্রিয় গানগুলোতেই বারবার ফিরছে। সঙ্গীত শিল্পের ভাষায় একে বলা হয় ডিপ ক্যাটালগ।

যুক্তরাজ্যের চিত্রটা বেশ স্পষ্ট। এ বছরের সর্বাধিক বিক্রিত শীর্ষ ২০টি গানের ১৮টিই প্রকাশিত হয়েছিল ১২ মাস বা তারও আগে। অষ্টম স্থানে আছে জারা লারসনের ‘লাশ লাইফ’, যেটি বের হয়েছিল ২০১৫ সালের জুনে। মাইকেল জ্যাকসনের ‘বিলি জিন’ (১৯৮৩) আছে ২২তম স্থানে, আর ফ্লিটউড ম্যাকের ‘ড্রিমস’ (১৯৭৭) ৩০তম স্থানে।

যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই ধারা আরএন্ডবি ও হিপ-হপের স্ট্রিমের প্রায় ৬০ শতাংশ আসছে পুরনো গান থেকে।

নতুন গান যখন হিট হয়, তখনও সেটি চার্টের শীর্ষে অনেক দিন থেকে যায়। স্যাম ফেন্ডার ও অলিভিয়া ডিনের ‘রেইন মি ইন’ ইউকে সিঙ্গেলস চার্টে টানা ২৩ সপ্তাহ এক নম্বরে থেকে নতুন রেকর্ড গড়েছে। আমেরিকায় এলা ল্যাংলির ‘চুজিন’ টেক্সাস’ মার্কিন চার্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় শীর্ষে থাকা গান হয়েছে।

শীর্ষে ওঠার জন্য প্রতিদিন লাখ লাখ স্ট্রিম লাগে। যুক্তরাজ্যের কম্পিটিশন অ্যান্ড মার্কেটস অথরিটির হিসাবে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্ট্রিম যায় মাত্র ০.৪ শতাংশ শীর্ষ শিল্পীর গানে। ফলে বাকি হাজার হাজার উঠতি শিল্পীর জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভাইরাল হওয়া মানেই ক্যারিয়ার তৈরি হওয়া নয়। টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম একটি নির্দিষ্ট গানকে ঘিরে হঠাৎ আলোড়ন তৈরি করতে পারে, কিন্তু শিল্পীর পরের গান বা দীর্ঘমেয়াদি ভক্ত তৈরিতে তেমন সাহায্য করে না। অনেকে তাই বলছেন, আজকাল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা হওয়া সহজ, কিন্তু সত্যিকারের ভক্ত তৈরি করা কঠিন।

এর মধ্যে এআইয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্পটিফাই জানিয়েছে, তারা ক্যাটালগ থেকে ৭৫ মিলিয়ন স্প্যামি ট্র্যাক সরিয়েছে। ডিজার বলছে, তাদের প্ল্যাটফর্মের মোট স্ট্রিমের মাত্র ০.৫ শতাংশ এআই-নির্মিত গান। অর্থাৎ এখনও বেশিরভাগ শোনা হচ্ছে মানুষের তৈরি গানই।

তবু উদ্বেগ আছে। এআই দিয়ে মুড বা উপলক্ষ অনুযায়ী প্লেলিস্ট বানানোর সুবিধা এখন স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক ও অ্যামাজন মিউজিকে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সিস্টেম মূলত আপনার আগের শোনার অভ্যাসের কাছাকাছি গানই সুপারিশ করে। যে ধারার ডেটা কম, সেই ধারার গান খুঁজে পাওয়া সিস্টেমের জন্য আরও কঠিন হয়ে যায়।

লন্ডনের স্বাধীন শিল্পী চিমিনিয়ো একটি ‘কজি জ্যাজ পিয়ানো’ প্লেলিস্ট দেখে সন্দেহে পড়েছিলেন। প্লেলিস্টটি স্পটিফাইতে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি বার সেভ হয়েছে। অথচ শীর্ষ শিল্পীদের অ্যাকাউন্ট যাচাই করা নয়, অনলাইনে তাঁদের সম্পর্কে তথ্যও প্রায় নেই। তাঁর অভিজ্ঞ কানে সব ট্র্যাকের পিয়ানোর আবহ আর রেকর্ডিংয়ের ধরন প্রায় একই লেগেছে। এর ভিত্তিতে তাঁর ধারণা, এগুলো কৃত্রিমভাবে বানানো। স্পটিফাই বলেছে, ছদ্মবেশ ধারণের বিরুদ্ধে তাদের নীতিমালা আছে এবং এআই-সংক্রান্ত সমস্যা ছাঁকনির প্রক্রিয়া উন্নত করা হচ্ছে।

প্ল্যাটফর্মগুলোও পদক্ষেপ নিচ্ছে। স্পটিফাই মানব শিল্পীদের জন্য ভেরিফায়েড ব্যাজ চালু করেছে এবং এআই-সৃষ্ট শিল্পীদের জন্য লেবেল যুক্ত করার কথা জানিয়েছে। অ্যাপল মিউজিকের প্রধান অলিভার শুসার বলেছেন, তাঁরা ‘আগামীকালের শিল্পীদের’ তুলে ধরতে চান, কারণ আজকের বড় মঞ্চের তারকারাও একসময় ছোট জায়গা থেকেই শুরু করেছিলেন।

লাইভ কনসার্টের মাধ্যমে নতুন শিল্পী আবিষ্কারের চেষ্টাও চলছে। সোফার সাউন্ডস বিশ্বের নানা শহরে ঘরোয়া পরিবেশে পপ-আপ কনসার্ট করে, যেখানে উঠতি শিল্পীরা পারফর্ম করেন। তারা ‘হিউম্যান ডিসকভারি মুভমেন্ট’ নামে একটি প্রচারণাও শুরু করেছে। এতে একটি রহস্যময় নম্বরে টেক্সট করলে তাদের সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নতুন গানের ভয়েস নোট সুপারিশ পাওয়া যায়।

পূর্ব লন্ডনের র‍্যাপার জে কাসা এ বছর অক্টোবরে সোফারের শোরডিচ ফ্রিঞ্জ উৎসবে পারফর্ম করেছেন। তাঁর মতে, কনটেন্টের ভিড়ে লাইভ পারফরম্যান্স শ্রোতা ও শিল্পীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা শুধু স্ট্রিমিংয়ে সম্ভব নয়।

তাহলে নতুন গান কি শেষ হয়ে যাচ্ছে? না। তবে ২০২৬ সালে তাকে লড়তে হচ্ছে নস্টালজিয়া, অ্যালগরিদম আর এআই-নির্মিত কনটেন্টের সঙ্গে একসঙ্গে। শ্রোতা হিসেবে আমরা চাইলে এই চক্র ভাঙতে পারি। প্লেলিস্টের বাইরে গিয়ে অচেনা শিল্পীর গান শোনা, লাইভ শোতে যাওয়া কিংবা মানুষের বাছাই করা সুপারিশ অনুসরণ করা, এই ছোট অভ্যাসগুলোই নতুন সঙ্গীতের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

তানভীর হাসান

তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *