Skip to content

হায়াও মিয়াজাকি: এক হাতে আঁকা স্বপ্নে বিশ্বজয়ের গল্প

হায়াও মিয়াজাকি: এক হাতে আঁকা স্বপ্নে বিশ্বজয়ের গল্প

আপনি যদি কখনো “স্পিরিটেড অ্যাওয়ে” বা “মাই নেইবার টটোরো” দেখে থাকেন, তাহলে জানেন একটা কার্টুন কীভাবে মনের ভেতর বাসা বাঁধতে পারে। এই সিনেমাগুলোর পেছনের মানুষটির নাম হায়াও মিয়াজাকি। জাপানের এই শিল্পীকে সারা বিশ্বের মানুষ ভালোবেসে অ্যানিমেশন জগতের জাদুকর বলে ডাকে।

১৯৪১ সালের ৫ জানুয়ারি টোকিওতে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি আর উড়োজাহাজের প্রতি তাঁর টান ছিল। তাঁর বাবার একটি বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছিল। সেই কারণেই পরে তাঁর প্রায় প্রতিটি সিনেমায় আকাশ, ডানা আর ওড়ার দৃশ্য ফিরে ফিরে এসেছে।

১৯৬৩ সালে তিনি টোই অ্যানিমেশনে কাজ শুরু করেন। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় ইসাও তাকাহাতার সঙ্গে, যিনি পরে তাঁর সবচেয়ে বড় সহকর্মী হয়ে ওঠেন। শুরুর বছরগুলোতে নাম ছিল না, টাকাও ছিল কম। কিন্তু সেই সময়েই তিনি নিজের আঁকার ধরন আর গল্প বলার ভঙ্গি গড়ে তুলছিলেন।

১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় “নাউসিকা অব দ্য ভ্যালি অব দ্য উইন্ড”। দূষিত পৃথিবী আর প্রকৃতিকে বাঁচানোর এক সাহসী মেয়ের গল্প। ছবিটি সফল হওয়ার পরের বছরই, ১৯৮৫ সালে, তিনি তাকাহাতা ও প্রযোজক তোশিও সুজুকির সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন স্টুডিও জিবলি। এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন যুগ।

এরপর একে একে আসে “ক্যাসল ইন দ্য স্কাই”, “মাই নেইবার টটোরো”, “কিকিস ডেলিভারি সার্ভিস” আর “প্রিন্সেস মনোনোকে”। প্রতিটি ছবি আলাদা, কিন্তু সবগুলোতে একটা মিল আছে। ছবিগুলো শিশুদের জন্য বানানো, অথচ বড়দেরও ভাবতে বাধ্য করে।

২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া “স্পিরিটেড অ্যাওয়ে” তাঁকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যায়। ছবিটি ২০০২ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার গোল্ডেন বেয়ার জেতে। ২০০৩ সালে এটি অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের পুরস্কার পায়। একটি হাতে আঁকা, অ-হলিউডি ছবির জন্য এটা ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

তাহলে কেন তাঁকে জাদুকর বলা হয়? প্রথম কারণ তাঁর হাতের কাজ। যখন পুরো দুনিয়া কম্পিউটার গ্রাফিক্সের দিকে ঝুঁকেছে, তখনও তিনি কাগজে পেন্সিলে প্রতিটি ফ্রেম আঁকার পক্ষে ছিলেন। তাঁর আঁকা মেঘ, বাতাসে দুলতে থাকা ঘাস কিংবা চায়ের কাপ থেকে ওঠা ধোঁয়া দেখলে বোঝা যায়, এই খুঁটিনাটির পেছনে কতটা ধৈর্য আর ভালোবাসা আছে।

হায়াও মিয়াজাকির বিখ্যাত সিনেমার পোস্টারের কোলাজ, যেখানে ক্যাসল অব ক্যালিওস্ট্রো, দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন, পোর্কো রোসো, নাউসিকা, দ্য উইন্ড রাইজেস, ক্যাসল ইন দ্য স্কাই, পোনিও, কিকিস ডেলিভারি সার্ভিস, প্রিন্সেস মনোনোকে, মাই নেইবার টটোরো, হাউলস মুভিং ক্যাসল ও স্পিরিটেড অ্যাওয়ে আছে
হায়াও মিয়াজাকির পরিচালিত ১২টি জনপ্রিয় অ্যানিমেশন সিনেমার পোস্টার

দ্বিতীয় কারণ প্রকৃতি। তাঁর গল্পে বন, নদী আর বাতাস শুধু পটভূমি নয়, তারা জীবন্ত চরিত্র। পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে তিনি কখনো সরাসরি বক্তৃতা দেননি, বরং গল্পের ভেতর দিয়ে দর্শককে ভাবিয়েছেন।

তৃতীয় কারণ তাঁর নারী চরিত্র। নাউসিকা, সান, চিহিরো, কিকি, এরা কেউ উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা রাজকন্যা নয়। এরা ভুল করে, ভয় পায়, তবু এগিয়ে যায়। এই বাস্তব, মানবিক চরিত্রগুলোই দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়।

আরেকটি বিশেষত্ব হলো তিনি ভালো আর মন্দকে সাদা-কালোয় ভাগ করেন না। তাঁর ছবির খলনায়করাও পুরোপুরি খারাপ নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব কারণ আছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানও পরিষ্কার, বিশেষ করে “হাউলস মুভিং ক্যাসল” আর “দ্য উইন্ড রাইজেস”-এ।

সুরের কথা না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকে। সুরকার জো হিসাইশির সঙ্গে তাঁর জুটি অনেক ছবির আবেগকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ছবির দৃশ্য মুছে গেলেও সেই সুর কানে লেগে থাকে।

২০১৩ সালে “দ্য উইন্ড রাইজেস” মুক্তির পর তিনি অবসরের ঘোষণা দেন। কিন্তু আঁকা ছাড়া তিনি থাকতে পারেননি। ২০১৪ সালে তিনি অস্কারের সম্মানসূচক পুরস্কার পান। এরপর ফিরে এসে বানান “দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন” (জাপানি নাম “কিমিতাচি ওয়া দো ইকিরু কা”)। ২০২৪ সালে এই ছবির জন্য তিনি দ্বিতীয়বারের মতো অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের পুরস্কার জেতেন।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বয়স ৮৫ হয়েছে, আর স্টুডিও জিবলির প্রযোজক তোশিও সুজুকি জানিয়েছেন তিনি এখনো কর্মচঞ্চল। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁর নতুন শিল্পকর্ম “প্যানোরামা বক্স” প্রকল্পের একটি ঝলক দেখানো হয়, যা জুলাই ২০২৬ থেকে জিবলির গ্র্যান্ড ওয়্যারহাউসে প্রদর্শিত হওয়ার কথা। তাঁর পরবর্তী সিনেমা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কিছু জানা যায়নি।

আজ জাপানে জিবলি মিউজিয়াম ও জিবলি পার্কে প্রতিদিন হাজারো মানুষ তাঁর সৃষ্টির জগতে ঢুকে পড়ছে। এই বিশ্বজোড়া ভালোবাসার মূলে আছে একটাই জিনিস: তিনি দর্শককে কখনো বোকা ভাবেননি, বরং তাদের অনুভূতি আর কল্পনার ওপর ভরসা রেখেছেন।

মিয়াজাকির ছবি আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধীরে চলা, প্রকৃতির দিকে তাকানো আর ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করাও জীবনের বড় অংশ। এই কারণেই তিনি শুধু একজন পরিচালক নন, অ্যানিমেশন জগতের সত্যিকারের জাদুকর।

তানভীর হাসান

তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *