
দোকানে দাঁড়িয়ে তিনটি শাড়ি পাশাপাশি রাখলেন। তিনটিই দেখতে জমকালো, তিনটির গায়েই লেখা “আসল”, অথচ দামে আকাশ-পাতাল ফারাক। কোনটা সত্যিই হাতে বোনা আর কোনটা কারখানার মেশিনে তৈরি, সেটা বুঝবেন কীভাবে?
জামদানি, টাঙ্গাইল আর কাতান বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত তিন শাড়ি। জনপ্রিয় বলেই এগুলোর নকলও বেশি। তবে একটু জানা থাকলে নিজেই অনেকটা যাচাই করে নেওয়া যায়।
শুরু করি জামদানি দিয়ে।

জামদানি মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের তাঁতশিল্প। ২০১৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৬ সালে এটি বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও নিবন্ধিত হয়।
আসল জামদানির নকশা কাপড়ের ওপর ছাপানো হয় না। বোনার সময় একটা একটা করে সুতা তুলে নকশা গাঁথা হয়। তাই উল্টো পিঠ দেখাটাই সবচেয়ে কাজের পরীক্ষা। হাতে বোনা শাড়িতে নকশাটা উল্টো দিকেও মোটামুটি পরিষ্কার বোঝা যায়। মেশিনের নকল শাড়িতে উল্টো পিঠে সাধারণত লম্বা সুতার ভাসা অংশ ঝুলে থাকে, নয়তো নকশা প্রায় দেখাই যায় না।
আরেকটা লক্ষণ হলো অতিরিক্ত নিখুঁত ভাব। হাতের কাজে মোটিফে সামান্য ছোটবড় হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিটি ফুল একেবারে হুবহু এক মাপের হলে একটু সন্দেহ করুন।
জমিন কেমন, সেটাও দেখে নিন। জামদানির জমিন হালকা ও নরম হয়, ঘন বুননেও ভেতর দিয়ে আলো কিছুটা আসে। মোটা, শক্ত বা কড়কড়ে কাপড় হলে সেটা আসল জামদানি না-ও হতে পারে।
এবার টাঙ্গাইল।

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প আলাদা পরিচয়ে পরিচিত। এ শাড়িও ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পেয়েছে। হালকা ওজন, আরামদায়ক বুনন আর নকশার বৈচিত্র্য এর বড় আকর্ষণ।
টাঙ্গাইল চিনতে পাড় আর আঁচলে মনোযোগ দিন। ভালো তাঁতের শাড়িতে পাড় জমিনের সঙ্গে একসঙ্গে বোনা হয়, তাই কোথাও জোড়ার দাগ থাকে না। পাড় আলাদা করে সেলাই করা মনে হলে বা সুতা টেনে ধরলে খুলে আসতে চাইলে সাবধান।
কাপড়টা মুঠোয় চেপে কয়েক সেকেন্ড ধরে ছেড়ে দিন। ভালো সুতার শাড়ি অল্প ভাঁজেই ফিরে আসে। বেশি কুঁচকে থাকলে বুঝবেন সুতার মান তেমন ভালো নয়। আর অতিরিক্ত মাড় দেওয়া শাড়ি থেকে দূরে থাকাই ভালো, কারণ মাড় অনেক সময় নিম্নমানের সুতা ঢেকে রাখে।
একটা তথ্য অনেকে জানেন না। টাঙ্গাইল শুধু সুতির নয়, সিল্ক ও হাফ-সিল্কেও পাওয়া যায়। তাই কেনার সময় সুতার ধরন সরাসরি জিজ্ঞেস করুন।
তৃতীয়টি কাতান।

কাতান ভারী, জমকালো আর বিয়ে-অনুষ্ঠানের শাড়ি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। ঢাকার মিরপুরের বেনারসি পল্লি এর জন্য পরিচিত। তবে বাজারে “কাতান” নামে অনেক ধরনের শাড়ি বিক্রি হয়। কোনোটা সিল্কের, কোনোটা মিশ্র সুতার, আবার কোনোটা পুরোটাই কৃত্রিম সুতার। নামে ভুলবেন না, সুতা কীসের সেটা জেনে নিন।
হাতে নিয়ে দেখুন। সিল্কের কাতান মসৃণ হয় কিন্তু প্লাস্টিকের মতো পিচ্ছিল নয়, আর ঝুলটা ভারী অথচ নরম। কৃত্রিম সুতার শাড়ি চকচকে দেখালেও হাতে খসখসে বা কৃত্রিম ঠেকে।
জরির দিকেও চোখ রাখুন। ভালো জরির কাজ বুননের সঙ্গে শক্তভাবে গাঁথা থাকে আর সহজে রং হারায় না। কম দামি জরি কয়েক মাসেই কালচে হয়ে যায় বা খুলে আসে।
সুতা পোড়ানোর পরীক্ষাটাও কাজে লাগে, তবে এটা কেনার পর বাড়িতে করতে হবে। আঁচলের একেবারে শেষ প্রান্তের একটা আলগা সুতা পুড়িয়ে দেখুন। প্রাকৃতিক সিল্ক পুড়লে চুল পোড়ার মতো গন্ধ আসে আর ছাই সহজে গুঁড়ো হয়ে যায়। কৃত্রিম সুতা গলে শক্ত গুটি হয়ে যায় আর প্লাস্টিক পোড়ার গন্ধ ছড়ায়।
দামের ব্যাপারে একটা সহজ হিসাব মনে রাখুন। হাতে বোনা শাড়ি তৈরিতে সময় ও শ্রম অনেক লাগে। একটি জামদানি বুনতে কখনো কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। তাই বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে “আসল হাতে বোনা” শাড়ি পেলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। দাম অবশ্য সুতার মান, নকশার জটিলতা আর তাঁতির দক্ষতা অনুযায়ী বদলায়, তাই কেনার আগে কয়েকটি দোকানে দর তুলনা করে নিন।
কোথা থেকে কিনছেন, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। সরাসরি তাঁতপল্লি, পরিচিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতা বা সরকারি-বেসরকারি হস্তশিল্প মেলা তুলনামূলক নিরাপদ। অনলাইনে কিনলে বিক্রেতার আগের ক্রেতাদের রিভিউ, ফেরত বা বদলের নিয়ম আর শাড়ির আসল ছবি ভালোভাবে দেখে নিন। পারলে ভিডিও কলে শাড়ির উল্টো পিঠ দেখে নিন।
রসিদ নিতে ভুলবেন না। তাতে শাড়ির ধরন, সুতার বিবরণ ও বিক্রেতার নাম থাকলে পরে কোনো সমস্যায় প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
কেনার পর যত্নও জরুরি। জামদানি ও কাতান সাধারণত ড্রাই ক্লিন করানোই নিরাপদ। টাঙ্গাইল শাড়ি ঠান্ডা পানিতে মৃদু সাবানে আলতো করে ধোয়া যায়, তবে কড়া রোদে শুকানো ঠিক নয়। ভাঁজ করে রাখার সময় প্রতিবার একই জায়গায় ভাঁজ না করে মাঝে মাঝে ভাঁজ বদলে নিন, নইলে ভাঁজের জায়গায় সুতা দুর্বল হয়ে পড়ে। আলাদা সুতি কাপড়ে মুড়ে রাখলে জরি ও রং বেশিদিন ভালো থাকে।
পাঠকদের কিছু প্রশ্ন প্রায়ই থাকে।
আসল জামদানি কি শুধু হাতেই বোনা হয়? হ্যাঁ, ঐতিহ্যবাহী জামদানি হাতে বোনা শাড়ি। মেশিনে জামদানির নকশা তুলে শাড়ি বানানো যায়, কিন্তু সেটিকে আসল জামদানি বলা ঠিক নয়।
টাঙ্গাইল কি কেবল সুতির হয়? না, সুতি ছাড়াও সিল্ক ও হাফ-সিল্ক টাঙ্গাইল পাওয়া যায়।
কাতান কি সবসময় খাঁটি সিল্কের হয়? না, বাজারে সিল্ক, মিশ্র ও কৃত্রিম সুতার কাতান মেলে। তাই সুতার ধরন জিজ্ঞেস করা জরুরি।
শেষ কথা হলো, কোনো একটি পরীক্ষা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। উল্টো পিঠের বুনন, সুতার অনুভূতি, জরির মান, দাম আর বিক্রেতার সুনাম, সবকিছু মিলিয়ে বিচার করুন। একটু সময় নিয়ে যাচাই করে কিনলে শাড়িটি অনেক বছর আপনার সঙ্গে থাকবে, আর একজন তাঁতির পরিশ্রমেরও ন্যায্য সম্মান দেওয়া হবে।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আপনার পছন্দ হতে পারে:

চুল পড়া কমাতে ঘরে বসেই বানান ৮টি কার্যকর হেয়ার প্যাক

বাংলাদেশের গরম আর আর্দ্রতায় ত্বক ভালো রাখার ১০টি সহজ ঘরোয়া নিয়ম

সন্তান জন্মের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর র্যাম্পে ফিরলেন বারবারা পালভিন, ভক্তদের জন্য রেখে গেলেন বড় বার্ত...
