
কয়েক বছর আগেও ঘরে বসে বিনোদন মানে ছিল টিভি নাটক আর ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান। সিনেমা দেখতে হলে যেতে হতো সিনেমা হলে, আর সেখানেও পছন্দের গল্প সবসময় মিলত না। এখন ছবিটা অনেক আলাদা। হাতের মোবাইলেই আছে একের পর এক সিরিজ, যেগুলো একবার শুরু করলে শেষ না করে ওঠা কঠিন।
২০২০ সালে হইচইতে তাকদীর আসার পর থেকে বাংলাদেশের ওটিটি দুনিয়ায় নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়। এরপর একে একে এসেছে মহানগর, কারাগার, মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন, গোলাম মামুন। এগুলো শুধু দেখার জন্য তৈরি হয়নি, দেখার পরও মানুষ এসব নিয়ে কথা বলেছে।
নিচের তালিকায় আছে সেই সিরিজগুলো, যেগুলো গল্প, অভিনয় আর নির্মাণের কারণে আলাদা করে মনে থাকে। প্রতিটির সঙ্গে আছে কাহিনির মোটামুটি পরিচয়, কেন দেখবেন আর কোথায় দেখা যাবে।
১। তাকদীর

২০২০ সালে হইচইতে মুক্তি পাওয়া আট পর্বের এই সিরিজের পরিচালক সৈয়দ আহমেদ শওকী। দেশের ওয়েব সিরিজের ইতিহাসে একে মাইলফলক ধরা হয়, কারণ এটিই প্রথম সিরিজ, যেটি দর্শক ও সমালোচক দুই পক্ষের কাছেই সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। যে দেশে দীর্ঘদিন গল্প বলার প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিভিশন, সেখানে ওয়েব সিরিজ নিয়ে এমন আগ্রহ আগে দেখা যায়নি।
গল্পের শুরু ঢাকার এক ফ্রিজার ভ্যানচালককে নিয়ে। একদিন নিজের গাড়িতেই সে একটি নারীর লাশ খুঁজে পায়। সাধারণ একজন মানুষ হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে পড়লে কী করবে? পুলিশের কাছে যাবে, না নিজেই সত্য খুঁজবে? এই দ্বন্দ্বেই পুরো গল্প এগোয়।
প্রতিটি পর্বের শেষে একটা নতুন প্রশ্ন সামনে আসে, আর সেটাই দর্শককে পরের পর্বে টেনে নিয়ে যায়। মূল চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ে ভয়, হতাশা আর বেঁচে থাকার চেষ্টা এত স্বাভাবিকভাবে ফুটেছে যে চরিত্রটিকে অভিনয় বলে মনেই হয় না। আইএমডিবিতে এর রেটিং প্রায় ৮.৬।
কোথায় দেখবেন: Hoichoi
২। মহানগর

আশফাক নিপুণের পরিচালনায় ২০২১ সালের জুনে হইচইতে আসে আট পর্বের মহানগর। এটি তাঁর প্রথম ওয়েব সিরিজ। মুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আইএমডিবিতে এর রেটিং ৮.৮ ছুঁয়েছিল, যা তখন বাংলাদেশি কনটেন্টের জন্য বড় ব্যাপার ছিল।
পুরো গল্প ঘটে ঢাকার একটি থানার ভেতরে, প্রায় সাত ঘণ্টার মধ্যে। এক প্রভাবশালী শিল্পপতির ছেলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থানায় আসে। রাত যত গভীর হয়, ততই সামনে আসে ক্ষমতা, টাকা আর দুর্নীতির আসল চেহারা। থানার ভেতরে অপরাধী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ আর প্রভাবশালীরা সবাই অপেক্ষা করে, সেই রাতের শেষে কী হবে।
ওসি হারুনের চরিত্রে মোশাররফ করিম এমন অভিনয় করেছেন যে চরিত্রটি নায়ক না খলনায়ক, সেটা শেষ পর্যন্ত বোঝা কঠিন। তাঁর পাশাপাশি জাকিয়া বারী মম, শামল মাওলা, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও খায়রুল বাসারের অভিনয়ও আলোচনায় আসে।
একজন দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে মূল চরিত্র করে গল্প বলা বাংলাদেশে নতুন ছিল। করোনা মহামারির সময় একটি ভবনে শুটিং হয়েছে, আর পুরো ইউনিট কাছের একটি গেস্ট হাউসে থেকে কাজ শেষ করেছে। ২০২৩ সালে এর দ্বিতীয় মৌসুমও এসেছে। আইএমডিবি রেটিং ৮.৭-এর কাছাকাছি।
কোথায় দেখবেন: Hoichoi
৩। কারাগার

২০২২ সালের ১৯ আগস্ট প্রথম পর্ব মুক্তি পাওয়ার পর কারাগার নিয়ে এমন আলোচনা শুরু হয় যে সিরিজটি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ভারতের দর্শকের কাছেও পৌঁছে যায়। পরিচালক সেই শওকীই, যিনি তাকদীর বানিয়েছিলেন। হইচইয়ের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে এটি ঘোষণা করা হয়েছিল। দুই পর্ব মিলিয়ে মোট পর্ব ১৪টি।
গল্পের মূল ধারণাটাই আলাদা। ১৯৭১ সাল থেকে তালাবদ্ধ একটি কারাকক্ষ হঠাৎ খোলা হয়, আর ভেতরে পাওয়া যায় এক রহস্যময় বন্দিকে। সে কে, কীভাবে এত বছর সেখানে ছিল, তার অতীতই বা কী? এসব প্রশ্ন ঘিরেই এগোয় রহস্য, ইতিহাস আর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মিশেল।
চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে আছেন ইনতেখাব দিনার, তাসনিয়া ফারিন ও এফএস নাঈম। গল্প লিখতে প্রায় এক বছর সময় লেগেছে, আর ঐতিহাসিক গবেষণাও করতে হয়েছে। ফলে ধারণাটি শুধু চমক নয়, পুরো গল্পে তার ভিত্তি টের পাওয়া যায়। আইএমডিবি রেটিং ৮.২।
কোথায় দেখবেন: Hoichoi
৪। পেট কাটা ষ

নুহাশ হুমায়ূন বাংলাদেশের হরর নির্মাণে এর আগেই আলোচিত নাম। তাঁর পেট কাটা ষ অ্যানথোলজি ধাঁচের সিরিজ, অর্থাৎ প্রতিটি পর্বে আলাদা গল্প, আলাদা চরিত্র। তবে সব গল্পের ভেতরেই মিশে আছে হরর আর লোককথার ছোঁয়া।
কোথাও ভূতের ভয়, কোথাও মনের ভেতরের আতঙ্ক, কোথাও গ্রামীণ কুসংস্কারের অন্ধকার। পুরোনো বাংলা লোকগল্পকে আধুনিক চোখে দেখানো হয়েছে। সব গল্পই কিছুটা অস্বস্তি দিয়ে যায়, আর দেখা শেষ হলেও মাথায় ঘুরতে থাকে।
বাংলাদেশে হরর কনটেন্ট তুলনামূলক কম, তাই এ ধরনের কাজ আলাদা নজর কাড়ে। যাঁরা সাধারণ থ্রিলারের বাইরে কিছু চান, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প।
কোথায় দেখবেন: Chorki
৫। মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন

গ্যাংস্টার ঘরানার গল্প বাংলাদেশে বেশি হয়নি। ২০২৩ সালে চরকিতে আসা মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন সেই ফাঁকটা ভরার চেষ্টা করেছে। ওই বছর যেসব ওটিটি কনটেন্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছিল, এটি তার একটি।
কেন্দ্রে আছে এক গ্যাংস্টারের জীবন। তার উত্থান, সম্পর্ক, ক্ষমতার লড়াই আর নিজের জায়গা ধরে রাখার সংগ্রাম গল্পের মূল। এখানে শুধু মারামারি বা গুলির দৃশ্য নেই, চরিত্রের ভেতরের চাপ আর একাকিত্বও দেখানো হয়েছে। অপরাধ জগৎ বাইরে থেকে যতটা চকচকে মনে হয়, ভেতরে আসলে তা নয়, সিরিজ সেটাই বোঝায়।
নাসির উদ্দিন খানের উপস্থিতি পুরো সিরিজকে ভারী করে তুলেছে। গতি একটু ধীর, তাই ধৈর্য নিয়ে দেখতে হবে। সহিংস দৃশ্য আছে বলে সিরিজটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
কোথায় দেখবেন: Chorki
৬। শাটিকাপ

পরিচালক মোহাম্মদ তৌকীর ইসলামের এই ক্রাইম থ্রিলার মুক্তির সময় খুব বেশি হাইপ পায়নি। কিন্তু যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই একে আন্ডাররেটেড বলেন।
গল্পের কাঠামো রহস্য আর অপরাধ ঘিরে। একের পর এক ঘটনা, সন্দেহভাজন চরিত্র আর ধীরে ধীরে সত্যের দিকে এগোনো, এভাবেই সিরিজ চলে। সব কথা একবারে বলে দেয় না, একটু একটু করে খোলে।
অভিনয় সংযত, নাটকীয়তা কম, আর সেটা সিরিজের টোনের সঙ্গে মানিয়েছে। মেইনস্ট্রিম জনপ্রিয়তা কম পেলেও সাসপেন্স ধরে রাখার ক্ষমতার জন্য ক্রাইম থ্রিলারপ্রেমীদের কাছে এটি ভালো সাড়া পেয়েছে।
কোথায় দেখবেন: Chorki
৭। গোলাম মামুন

হইচইয়ের বুকের মধ্যে আগুন সিরিজের গোলাম মামুন চরিত্রটি দর্শকের এতই পছন্দ হয়েছিল যে তাকে নিয়ে আলাদা স্পিন-অফ সিরিজ তৈরি হয়। জিয়াউল ফারুক অপূর্ব মূল চরিত্রে, পরিচালক শিহাব শাহীন।
বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প এখানে বাস্তবের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা আছে। একজন অপরাধ জগতের মানুষের উত্থান, ক্ষমতার খেলা আর ব্যক্তিজীবনের দ্বন্দ্ব পাশাপাশি চলে। কিছুই অতিরিক্ত গ্ল্যামারাইজ করা হয়নি, আর সেই সততাই দর্শককে টেনেছে।
২০২৬ সালে হইচইতে এর দ্বিতীয় কিস্তি আসার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। দর্শক সেটির অপেক্ষায় আছেন।
কোথায় দেখবেন: Hoichoi
৮। বোহেমিয়ান ঘোড়া

পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী এই সিরিজে প্রচলিত গল্প বলার নিয়ম মানেননি। মোশাররফ করিম অভিনীত এই কাজে সময়, ঘটনা আর চরিত্র সরলরেখায় আসে না, ভেঙে ভেঙে সামনে আসে।
এ কারণে সিরিজটি দেখতে মনোযোগ লাগে। মাঝপথে ফোন হাতে নিলে অনেক কিছু হারিয়ে যেতে পারে। সবার জন্য নয়, তবে নতুন ধরনের গল্প যাঁরা খোঁজেন, তাঁদের কাছে এটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। মোশাররফ করিমের অভিনয় সবসময়ের মতো এখানেও ভরসার জায়গা।
কোথায় দেখবেন: Hoichoi
৯। কাইজার

আফরান নিশো অভিনীত এই ক্রাইম থ্রিলারের কেন্দ্রে আছেন কাইজার নামের এক তদন্তকারী। তিনি বিভিন্ন জটিল অপরাধের তদন্ত করেন। তবে গল্প শুধু কেস সমাধানে থেমে থাকে না। প্রতিটি অপরাধের পেছনের মানবিক ও অন্ধকার দিকও সামনে আসে।
তদন্ত, রহস্য আর সাসপেন্সের এই মিশেল অনেক দর্শকের কাছে নেশা ধরানোর মতো লেগেছে। নিশোর অভিনয় চরিত্রটিকে সিরিয়াস ও বিশ্বাসযোগ্য করেছে।
কোথায় দেখবেন: বাংলাদেশি ওটিটি অ্যাপে (Hoichoi বা Chorkiতে খুঁজে নিন)
১০। কালপুরুষ

সময়, স্মৃতি আর বাস্তবতার ধাঁধা নিয়ে তৈরি এই সিরিজের টোন গাঢ় আর খানিকটা দার্শনিক। এটি দ্রুত গতির বিনোদন নয়। ধীরে ধীরে একটা আবহ তৈরি করে, যেখানে চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব অনুভব করতে হয়।
সবার জন্য নয়, আর সেটাই এর বৈশিষ্ট্য। অভিনয় নিয়ন্ত্রিত ও গম্ভীর, বাড়াবাড়ি নেই। যাঁরা গভীর ও ভিন্ন ধরনের কনটেন্ট পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এটি আলাদা অভিজ্ঞতা।
কোথায় দেখবেন: বাংলাদেশি ওটিটি অ্যাপে (Hoichoi বা Chorkiতে খুঁজে নিন)
কোনটা আগে দেখবেন?
পছন্দ ঠিক করতে না পারলে সহজ একটা হিসাব মনে রাখতে পারেন।
থানার ভেতরের চাপা উত্তেজনা ও বাস্তবধর্মী গল্প চাইলে মহানগর। সাধারণ মানুষের দুঃস্বপ্নের গল্প চাইলে তাকদীর। অদ্ভুত রহস্য চাইলে কারাগার। গা ছমছমে অনুভূতি চাইলে পেট কাটা ষ। ডার্ক গ্যাংস্টার গল্প চাইলে মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন বা গোলাম মামুন। চেনা ছকের বাইরে কিছু চাইলে বোহেমিয়ান ঘোড়া বা কালপুরুষ।
সবচেয়ে ভালো বাংলাদেশি ওয়েব সিরিজ কোনটি?
এটা পছন্দের ব্যাপার। তবে আইএমডিবির ব্যবহারকারী রেটিং ধরলে মহানগর ও তাকদীর সবার আগে থাকে, তারপর কারাগার। নতুন দর্শকের জন্য এই তিনটি দিয়ে শুরু করাই নিরাপদ।
কোথায় দেখলে ভালো হয়?
বেশিরভাগ আলোচিত সিরিজ হইচই আর চরকিতে পাওয়া যায়। অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন নিয়ে দেখলে ভালো মানের ভিডিও পাওয়া যায়, আর নির্মাতারাও কাজের মূল্য পান। পাইরেটেড সাইটে দেখলে ভিডিওর মান খারাপ হয়, তার সঙ্গে ভাইরাসের ঝুঁকিও থাকে। কোনো সিরিজ কখন কোন প্ল্যাটফর্মে থাকবে তা বদলাতে পারে, তাই দেখার আগে অ্যাপে একবার যাচাই করে নেবেন।
সবগুলো কি পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা যায়?
না। এই তালিকার বেশিরভাগ সিরিজে সহিংসতা, গালাগালি বা ভয়ের দৃশ্য আছে। তাই ছোটদের সঙ্গে দেখার আগে প্ল্যাটফর্মের বয়সসীমা দেখে নেওয়া উচিত।
প্রতি বছরই নতুন সিরিজ আসছে, আর দর্শকের চাহিদাও বাড়ছে। তাই এই তালিকা সময়ের সঙ্গে বদলাবে। আপাতত এই দশটি দিয়ে শুরু করলে বাংলাদেশের ওয়েব সিরিজের সেরা কাজগুলোর সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচয় হয়ে যাবে।
আপনার প্রিয় সিরিজ কোনটি, কমেন্টে জানান।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আপনার পছন্দ হতে পারে:

কোন সিনেমা দেখবেন ভেবে পাচ্ছেন না? Netflix-এ এই ১০টি মুভি দিয়ে শুরু করুন

কোরিয়ান ড্রামা দেখা শুরু করবেন? আগে এই ১০টি দেখে নিন

ওটিটিতে নতুন চমক: মিমি-আবীরের ‘আলাপ’, নেটফ্লিক্সের জাপানি সিরিজসহ ৫টি কনটেন্ট
