
কয়েক বছর আগেও কোরিয়ান ড্রামা মানে ছিল কিছু মানুষের গোপন শখ। এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এর দর্শক। কেউ দেখেন রোমান্সের টানে, কেউ থ্রিলারের জন্য, আবার অনেকে শুধু একটা ভালো গল্প খোঁজেন। আর কোরিয়ান ড্রামা সেই চাহিদা ভালোভাবেই মেটায়।
সমস্যা একটাই। এত ড্রামার ভিড়ে প্রথমে কোনটা দেখবেন, সেটা বোঝা কঠিন। এই লেখায় আছে এমন ১০টি ড্রামা, যেগুলো গল্প, অভিনয় আর দর্শকের ভালোবাসায় আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিটির সঙ্গে আছে কাহিনির পরিচয়, কেন দেখবেন আর কোথায় দেখা যাবে।
১। ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ

২০১৯ সালের শেষে টিভিএনে শুরু হওয়া ১৬ পর্বের এই ড্রামা কোরিয়ান ড্রামাকে নতুন করে বিশ্বের নজরে এনেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এক ধনী উত্তরাধিকারী প্যারাগ্লাইডিং করতে গিয়ে ঝড়ে পড়ে উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে নেমে যান। সেখানে তাঁর দেখা হয় এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে, যিনি তাঁকে লুকিয়ে সাহায্য করেন।
দুই বিপরীত জগতের দুজন মানুষের প্রেম, হাসি আর উদ্বেগ নিয়ে এগোয় গল্প। হিউন বিন ও সন ইয়ে-জিনের রসায়ন এ ড্রামার সবচেয়ে বড় শক্তি। কোরিয়ায় এর সর্বোচ্চ দর্শক রেটিং ছিল প্রায় ২১.৭ শতাংশ, যা কেবল টিভিতে সম্প্রচারিত ড্রামার জন্য অনেক বড় সংখ্যা।
রোমান্স ও হালকা হাসির ড্রামা দিয়ে শুরু করতে চাইলে এটি সবচেয়ে নিরাপদ বাছাই।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
২। গবলিন

২০১৬ সালের শেষ থেকে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে সম্প্রচারিত এই ফ্যান্টাসি রোমান্সের আসল নাম গার্ডিয়ান: দ্য লোনলি অ্যান্ড গ্রেট গড। ১৬ পর্বের গল্পে আছেন গং ইউ, কিম গো-ইউন, লি ডং-ওয়ুক ও ইউ ইন-না।
কাহিনির মূলে এক গবলিন, যাকে শত শত বছর ধরে অমর থাকার অভিশাপ বইতে হচ্ছে। সেই অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তাঁর বুকে বিঁধে থাকা তলোয়ার খুলে দেওয়া, যা করতে পারে কেবল তাঁর স্ত্রী। এক স্কুলছাত্রী নিজেকে সেই স্ত্রী বলে দাবি করে ওঠে। পাশাপাশি গল্পে আছে এক মৃত্যুদূত আর এক রহস্যময় বাড়িওয়ালি।
এই ড্রামা একসঙ্গে হাসায়, কাঁদায় আর ভাবায়। কোরিয়ায় এর সর্বোচ্চ রেটিং ছিল প্রায় ১৮.৭ শতাংশ। আইএমডিবিতেও এর রেটিং ৮-এর ওপরে।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স (কিছু অঞ্চলে ভিকি বা অন্য প্ল্যাটফর্মেও থাকতে পারে)
৩। মাই মিস্টার

২০১৮ সালে টিভিএনে প্রচারিত ১৬ পর্বের এই ড্রামাকে অনেকে সর্বকালের সেরা কোরিয়ান ড্রামার একটি বলেন। আইএমডিবিতে এর রেটিং প্রায় ৯.০।
গল্পটা কোনো বড় অ্যাকশন বা চমকের নয়। এক ক্লান্ত মধ্যবয়সী প্রকৌশলী আর অল্পবয়সী এক নারীর গল্প, যার জীবনে বোঝা অনেক। দুজন দুজনের নীরব পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। লি সান-গিউন ও আইইউ-র অভিনয় এতটাই সংযত আর গভীর যে দর্শক নিজেকে চরিত্রের জায়গায় বসিয়ে ফেলে।
এটি ধীর গতির ড্রামা, তাই তাড়াহুড়ো করে দেখার জিনিস নয়। কিছু দৃশ্য ভারী, মন খারাপ করার মতো। মন দিয়ে একটা গভীর গল্প দেখতে চাইলে এটি আপনার জন্য।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
৪। রিপ্লাই ১৯৮৮

১৯৮৮ সালের সিউলের এক ছোট পাড়া, পাশাপাশি পাঁচটি পরিবার। এই ড্রামার গল্প মূলত তাঁদের প্রতিদিনের জীবন নিয়ে। ২০১৫ সালের শেষ থেকে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে টিভিএনে প্রচারিত হয়েছে ২০ পর্ব।
এখানে বড় কোনো খলনায়ক নেই, বড় কোনো রহস্যও নেই। আছে প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া, বন্ধুদের খুনসুটি, বাবা-মায়ের চুপচাপ ভালোবাসা আর কৈশোরের প্রথম প্রেম। লি হে-রি, পার্ক বো-গাম ও রিউ জুন-ইওলের অভিনয়ও দারুণ।
শেষ পর্বে পৌঁছে অনেক দর্শক বলেন, এই পাড়াটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। পরিবার আর বন্ধুত্ব নিয়ে উষ্ণ কিছু দেখতে চাইলে এটি ভালো বাছাই।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
৫। স্কাই ক্যাসেল

২০১৮ সালের শেষ থেকে ২০১৯ সালের শুরু পর্যন্ত জেটিবিসিতে প্রচারিত ২০ পর্বের এই ড্রামা এক ধনী এলাকার অভিজাত পরিবারগুলোর গল্প বলে। সন্তানকে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর অন্ধ প্রতিযোগিতায় বাবা-মায়েরা কতদূর যেতে পারেন, সেটাই এর বিষয়।
গল্পটা বাইরে থেকে সফল পরিবারের, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত চাপ, মিথ্যা আর স্বার্থ। এই ড্রামা সমাজের একটি বাস্তব সমস্যাকে খুব জোরালোভাবে সামনে এনেছে। কোরিয়ায় এর সর্বোচ্চ রেটিং ছিল প্রায় ২৩.৮ শতাংশ, যা কেবল কেবল চ্যানেলের ড্রামার জন্য রেকর্ড ছিল।
সামাজিক থ্রিলার পছন্দ হলে এটি মিস করবেন না।
কোথায় দেখবেন: অঞ্চলভেদে নেটফ্লিক্স বা ভিকিতে খুঁজে নিন
৬। ইটস ওকে টু নট বি ওকে

২০২০ সালে টিভিএনে আসা ১৬ পর্বের এই ড্রামায় কিম সু-হিউন, সিও ইয়ে-জি ও ওহ জুং-সে অভিনয় করেছেন। গল্পের কেন্দ্রে এক মানসিক হাসপাতালের কেয়ারগিভার আর এক জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক, যিনি নিজেও মানসিক চাপে ভুগছেন।
ড্রামাটি সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে মানুষের কষ্ট আর ক্ষত নিয়ে খোলামেলা কথা বলার জন্য। রূপকথার মতো ছবি, দৃশ্যসজ্জা আর পোশাকও আলাদা করে নজর কাড়ে। রোমান্সের পাশাপাশি এখানে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্কের গল্পও আছে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু ভারী দৃশ্য আছে, তাই মন ভালো না থাকলে একটু ভেবে দেখবেন।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
৭। এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাটর্নি উ

২০২২ সালে ইএনএ চ্যানেলে প্রচারিত ১৬ পর্বের এই ড্রামা এক ব্যতিক্রমী নায়িকার গল্প। উ ইয়ং-উ একজন অটিজম স্পেকট্রামে থাকা তরুণ আইনজীবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি অসাধারণ আর আইনি যুক্তি অনন্য, কিন্তু সামাজিক আচরণে তিনি বারবার বাধার মুখে পড়েন।
প্রতিটি পর্বে একটি করে নতুন মামলা থাকে, আবার পাশাপাশি চলে উ ইয়ং-উর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প। পার্ক ইউন-বিন চরিত্রটিকে এত যত্নে ফুটিয়েছেন যে দর্শক তাঁকে সহজেই ভালোবেসে ফেলেন। কাং তে-ওহও গল্পে সুন্দর উষ্ণতা আনেন।
হালকা, মনভালো-করা অথচ ভাবনা জাগানো কিছু চাইলে এটি দারুণ।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
৮। ভিনসেঞ্জো

২০২১ সালে টিভিএনে প্রচারিত ২০ পর্বের এই ড্রামার নায়ক ভিনসেঞ্জো ক্যাসানো, ইতালির মাফিয়া পরিবারের একজন আইনি উপদেষ্টা। পারিবারিক বিরোধের কারণে তিনি কোরিয়ায় ফিরে আসেন, আর সেখানে এক শক্তিশালী কর্পোরেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। সঙ্গে আছেন একজন আইনজীবী চা-ইয়ং, যাঁর ভূমিকায় জিওন ইয়ো-বিন দারুণ।
সং জুং-কি এখানে ঠান্ডা মাথার অথচ মজার এক চরিত্র। এই ড্রামা একসঙ্গে অ্যাকশন, থ্রিলার আর কমেডি দিয়ে ভরা। খলনায়কদের প্রতি দর্শকের রাগ, আর শেষে ন্যায়বিচারের তৃপ্তি, দুটোই সমানভাবে জমে।
কিছু দৃশ্যে সহিংসতা আছে। তবে হাসির মোড় দিয়েই গল্প ভারসাম্য রাখে।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
৯। দ্য গ্লোরি

নেটফ্লিক্সের নিজস্ব এই ড্রামার প্রথম অংশ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় অংশ ২০২৩ সালের মার্চে মুক্তি পায়। মোট ১৬ পর্ব। সং হে-কিও এখানে মুন ডং-ইউনের ভূমিকায়, যিনি স্কুলজীবনে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
বছরের পর বছর অপেক্ষা আর পরিকল্পনার পর তিনি প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসেন। গল্পের গতি নিয়ন্ত্রিত, প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করা। লিম জি-ইয়ন, লি দো-হিউন ও জুং সুং-ইলসহ প্রায় সব অভিনেতাই নজর কেড়েছেন।
এটি একটি গাঢ় ও নির্মম ড্রামা। স্কুলের নির্যাতন আর সহিংসতার দৃশ্য আছে, তাই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
১০। হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস

২০২৫ সালে নেটফ্লিক্সে আসা এই ড্রামায় আইইউ ও পার্ক বো-গাম অভিনয় করেছেন। গল্পটা জেজু দ্বীপের এক নারী ও এক পুরুষের, যাঁদের জীবন কয়েক দশক ধরে একসঙ্গে বদলাতে থাকে। মোট ১৬ পর্ব, চারটি অধ্যায়ে সাজানো।
এই ড্রামার আবহ শান্ত, ধীর আর গভীর। অভাব, ভালোবাসা, মা-বাবার ত্যাগ আর সময় পেরিয়ে যাওয়ার কথা এখানে খুব সরলভাবে বলা হয়েছে। পরিচালক কিম ওন-সিক এর আগে মাই মিস্টার-এর মতো কাজও করেছেন, আর এখানেও সেই সংবেদনশীলতার ছাপ আছে।
অনেক দর্শক বলেছেন, এটি দেখতে গিয়ে তাঁরা নিজের পরিবারের কথা ভেবেছেন। মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো কিছু চাইলে হাতে রুমাল রেখে দেখুন।
কোথায় দেখবেন: নেটফ্লিক্স
প্রথমে কোনটা দেখবেন?
পছন্দ ঠিক করতে না পারলে এভাবে ভাবতে পারেন।
রোমান্স ও হাসি চাইলে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ বা গবলিন। উষ্ণ পারিবারিক গল্প চাইলে রিপ্লাই ১৯৮৮। গভীর ও আবেগী কিছু চাইলে মাই মিস্টার বা হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস। থ্রিলার ও প্রতিশোধ চাইলে ভিনসেঞ্জো বা দ্য গ্লোরি। সমাজ নিয়ে ভাবনা জাগানো গল্প চাইলে স্কাই ক্যাসেল। মনভালো-করা আদালতের গল্প চাইলে এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাটর্নি উ।
কোরিয়ান ড্রামা কোথায় দেখলে ভালো হয়?
বেশিরভাগ আলোচিত ড্রামা নেটফ্লিক্সে পাওয়া যায়। কিছু ড্রামা অঞ্চলভেদে ভিকি বা অন্য প্ল্যাটফর্মে থাকে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্ল্যাটফর্মে দেখলে ভিডিও ও সাবটাইটেলের মান ভালো পাওয়া যায়, আর নির্মাতারাও কাজের মূল্য পান। পাইরেটেড সাইটে ভাইরাস আর নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। কোনো ড্রামা কখন কোন প্ল্যাটফর্মে থাকবে তা বদলাতে পারে, তাই দেখার আগে অ্যাপে একবার যাচাই করে নেবেন।
কোরিয়ান ভাষা না জানলেও কি দেখা যায়?
হ্যাঁ। প্রায় সব প্ল্যাটফর্মে ইংরেজি সাবটাইটেল থাকে। কিছু ড্রামায় বাংলা সাবটাইটেলও পাওয়া যায়, তবে সেটা সবসময় নিশ্চিত নয়।
সবগুলো কি পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা যায়?
না। মাই মিস্টার, দ্য গ্লোরি, ইটস ওকে টু নট বি ওকে এবং ভিনসেঞ্জো-তে ভারী বিষয় ও সহিংস দৃশ্য আছে। ছোটদের সঙ্গে দেখার আগে প্ল্যাটফর্মের বয়সসীমা দেখে নেওয়া ভালো।
প্রতি বছরই নতুন কোরিয়ান ড্রামা আসছে, আর তালিকাও বদলাচ্ছে। তবে আপাতত এই দশটি দিয়ে শুরু করলে কোরিয়ান ড্রামার সেরা কাজগুলোর সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচয় হয়ে যাবে।
আপনার প্রিয় কোরিয়ান ড্রামা কোনটি, কমেন্টে জানান।
তানভীর হাসান
তানভীর হাসান একজন বিনোদন ও পপ-কালচার গবেষক। দেশি-বিদেশি শোবিজ, সেলিব্রিটিদের লাইফস্টাইল ও ট্রেন্ডিং খবর কভার করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি wowbangla.com-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আপনার পছন্দ হতে পারে:

ওটিটিতে নতুন চমক: মিমি-আবীরের ‘আলাপ’, নেটফ্লিক্সের জাপানি সিরিজসহ ৫টি কনটেন্ট

বাংলাদেশের সেরা বাংলা ওয়েব সিরিজ, যেগুলো না দেখলে সত্যিই মিস করবেন

কোন সিনেমা দেখবেন ভেবে পাচ্ছেন না? Netflix-এ এই ১০টি মুভি দিয়ে শুরু করুন
